শুক্রবার, ২৫ মে, ২০১৮

খুন যদি হয় সমাধান,তবে কেন “রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ"এই স্লোগান সম্বলিত প্রতিষ্ঠান ?

মাদক ব্যবসা কোন সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে করা কখনোই  সম্ভব নয়। সমাজের যে সাধারণ মানুষটিকে মাদক ব্যবসা করতে দেখা যায় তার পেছনে হয়তো প্রশাসনিক অথবা রাজনৈতিক সহায়তা থাকে। সমাজের একজন ক্ষমতাধর ব্যক্তি কখনো নিজে হাতে মাদকের ফেরী করেনা, তারা এজেন্ট হিসেবে বেছে নেয় সমাজের বেকার হতাশাগ্রস্ত যুবকদের।তারাই এই যুবকদের দিয়ে যুব সমাজের হাতে মাদক তুলে দিয়ে যুব সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।প্রশাসনের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতাদের অর্থ বিত্ত বৈভবের গোপন সূত্র খুঁজতে গেলে দেখা যায় এর মূলে রয়েছে রাষ্ট্রীয় ভাবে নিষিদ্ধ কোন অবৈধ ব্যবসা।মাদক যখন কোন দেশের সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে সেখানে প্রশাসনের সহায়তা থাকে, মাদক যখন স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয় সেখানেও প্রশাসনের সহায়তা থাকে । এই সহায়তা যদি শুরু থেকে না করা হয় এবং শক্ত হাতে দমন করা হয় তাহলেতো এর  বিস্তার ঘটেনা। মাদকের অভিযানের নামে সংশোধনের সুযোগ না দিয়ে  বিচার বহির্ভূত ভাবে মানুষ হত্যার উৎসব করার প্রয়োজন হয়না ।

এই প্রসঙ্গে আমার দেখা বাস্তব অভিজ্ঞতার একটু বর্ণনা করি, আমার জেলা রাজবাড়ীতে এক সময় ভারতীয় ফেনসিড্রিলের  রমরমা ব্যবসা হতো । যারা এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাদের  মাঝে মাঝে  জীবন যাত্রার হালচাল দেখে বেশ ধনী মনে হতো। কিন্তু এমন সুখের সময় হঠাৎই পুলিশ এদের মাদক ব্যবসার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেতো, তখন মাদক ব্যবসায়ীর স্ত্রী নিয়মিত থানা কোট কাচারিতে দৌড়াদৌড়ি করতো। এভাবে মাস দুয়েক  ফেনসিড্রিল ব্যবসার জমানো সব টাকা পুলিশ,  উকিল, আদালতের পেছনে খরচ করে  স্বামীকে জেল থেকে জামিনে মুক্ত করে বের করে নিয়ে আসতো। বেড়িয়ে আসার পর ওপার থেকে  আবার সীমান্ত প্রহরীদের টাকা পয়সা দিয়ে ট্রেনে করে জি আর পি পুলিশের সহায়তায়  ফেনসিড্রিলের চালান নিয়ে আসতো। আবার রমরমা ব্যবসা, নগদ টাকার উড়াউড়ি। সেই টাকার গন্ধে আবার পুলিশের হানা। আবার স্ত্রী’র কোট কাচারিতে দৌড়াদৌড়ি, থানা পুলিশ, উকিলের পেছনে ব্যবসার জমানো সমস্ত টাকা ঢেলে প্রিয় স্বামীকে মুক্ত কড়ে নিয়ে আসা। ওই মাদক ব্যবসায়ীকে পুলিশ বারবার মাদকসহ গ্রেপ্তার করলেও কখনো সংশোধনের সুযোগের জন্য মাদক আইনে সাজা ভোগ করে দীর্ঘদিন কারাবাস হতে দেখিনি।অর্থাৎ পুলিশের হাতে ধরা পড়া, জামিনে ছাড়া পাওয়া, আবার ব্যবসা করা এটাই ছিল তাদের জীবনের নিয়মিত অংশ ।যারা এই ব্যবসা করতো তারা মূলত কিছুদিন ইলিশ মাছ, মাংস দিয়ে ভাত  খেত আর ভালো কাপড় পড়তো,কিন্তু পাকা বাড়ী বানাতে পারতোনা কারণ, নগদ জমলেই পুলিশ হানা । ওর জীবন ঝুঁকির টাকায় হয়তো পুলিশ অফিসারের ফ্ল্যাটের কিস্তি পরিশোধ  হতো, রাজনৈতিক নেতার ভাই কিংবা বোন জামাইয়ের টাকার বাণ্ডিলের উপর বাণ্ডিল জমতো, কোটের উকিলের রুটি রুজি ভালো হতো। আর এই কারণেই ওই সব মাদক ব্যবসায়ীদের কখনো সংশোধনের জন্য সাজার ব্যবস্থা করা হতোনা। ওর সাজা হলে পুলিশ, রাজনৈতিক নেতা,  উকিলদের উপরি আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যায়।

নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে মাদক ব্যবসা মূলত প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে মাদক বিক্রেতা,আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, এই তিনের সমন্বয়েই সম্পন্ন হয়ে থাকে।দেশে যখন কোন বিশেষ অভিযান শুরু হয় তখন দেখা যায় যে লোকটা মাদক ব্যবসার টাকায় ইলিশ মাছ আর মাংস খায় ওই মারা পড়ে, যাদের  মাদকের টাকায় ফ্ল্যাটের কিস্তি পরিশোধ হয় তাদের গুলিতে এবং টাকার বাণ্ডিলের পর বাণ্ডিল রাখা মহৎ জনদরদী নেতাদের পরিকল্পনায়।দেশের ক্ষমতাসীনরা যদি জনদরদী হয়ে থাকে তবে হঠাৎ করে বিশেষ অভিযানের প্রয়োজন আছে কি? তাদের সুশাসনের ফলে মাদকসহ আইন শৃঙ্খলা অবস্থা সারা বছর স্বাভাবিক থাকবে।সরকারের উদ্দেশ্য যদি মহৎ হয়ে  থাকে তাহলে একটি জীবন্ত মানুষকে হত্যা না করে তাকে বিচারের সম্মুখীন করা হোক এবং মাদকের মূল হোতাদের আবিষ্কারের জন্য তাকে সরকারের পক্ষ থেকে নির্ভয় দিয়ে মিডিয়া এবং সমাজ সচেতন মানুষের উপস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় আইনে  বিচারের ব্যবস্থা করা হোক। রাষ্ট্র জনগণের কাছে পিতা মাতার মতো,সন্তানদের ভুল শুধরে সঠিক পথ দেখানোই তার  দায়িত্ব।  কিন্তু আমদের রাষ্ট্র অভিভাবক আমাদের  ভরণপোষণের ক্ষমতা রাখেনা, রুটি রুজির ব্যবস্থা করতে পারেনা,অথচ যখন  নিজহাতে হত্যা করার  ধৃষ্টতা দেখিয়ে  বর্বর উৎসবে মেতে ওঠে, তখন  বুঝতে হবে আমাদের রাষ্ট্র মাতা সৎ পিতার অধীনের সংসার করছে। হত্যা যদি সমাধানের পথ হয় তবে  জেল গেটের ফটকে লেখা “রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ” এ জাতিও নীতিবাক্যকে হাস্যকর মনে হয় এবং এমন প্রতিষ্ঠান নিষ্প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

সরকার যদি সত্যিই আন্তরিক ভাবে বাংলাদেশকে মাদকমুক্ত করতে চাই তাহলে প্রথম পদক্ষেপ হবে সরকারে ক্ষমতার মধ্যে থেকে কারা মাদক ব্যবসার পৃষ্ঠপোষকতা করে তাদেরকে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা।এই পদক্ষেপ কার্যকর করতে পারলে মাদক সমস্যার ৬০% সমাধান। দ্বিতীয়ত আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সৎ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে তৈরি তদন্ত কমিটির মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে বাহিনীর কোন সদস্যের মাদক ব্যবসার  সহযোগিতায় যোগসাজশ রয়েছে এবং প্রমাণিত অসৎ সদস্যদের বাহিনী থেকে চাকুরীচ্যূতির মাধ্যমে বের করে দিতে হবে। এতে ৩০% সমাধান মিলবে।বাকী দশ ভাগ সমস্যার সমাধান মিলবে , মাঠ পর্যায়ে যারা মাদক সেবীদের নিকট সরাসরি মাদক পৌঁছে দিয়ে অর্থ উপার্জন করে তাদেরকে ঝটিকা অভিযানের মাধ্যমে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে সংশোধনের সুযোগ দেয়া।   

মঙ্গলবার, ১ মে, ২০১৮

সূত্র অনুযায়ী পৃথিবীর সমস্ত পেশার ভিত্তি কৃষক ও শ্রমিকের পেশা

সূত্র অনুযায়ী পৃথিবীর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ   পেশা কৃষক ও শ্রমিকের পেশা এবং পৃথিবীর সমস্ত পেশা গড়ে উঠেছে এই দুটি পেশার উপর ভিত্তি করে । পৃথিবীতে যে কর্মযজ্ঞ ও যা কিছু হচ্ছে তা এই দুটি পেশাকে কেন্দ্র করে।আজ অফিস আদালত, ব্যাংক বীমা,শিক্ষা, আবিষ্কার, রাষ্ট্র যন্ত্রের প্রতিটি বিভাগ, পৃথিবীর যাবতীয় ঘটনাপুঞ্জ এই দুটি পেশার উপর নির্ভরশীল। কৃষকের উৎপাদন ও শ্রমিকের শ্রমেই গড়ে উঠে ব্যবসা বাণিজ্য, লেনদেন, কর্পোরেটদের স্যুট কোট টাইয়ের পরিপাটি পোশাক।যদি কখনো কৃষক তার খাদ্য উৎপাদন ও শ্রমিক তার পণ্য উৎপাদন কিছু দিনের জন্য বন্ধ করে দেয় তাহলে রাষ্ট্র তথা পৃথিবী যাবতীয় তন্ত্র মন্ত্র , প্রণালী, পদ্ধুতি স্থবির হয়ে পরবে।প্রয়োজন হলে বাঁচার তাগিদে ব্যাংকার তার তার স্যুট কোট পড়ে, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি তার মন্ত্রী ও সচিবদের নিয়েই তুলতুলে চেয়ার ফেলে হাতুড়ী কাস্তে হাতে নিয়েই মাঠে নামতে হবে ।কৃষক ও শ্রমিকের ঘাম যত বেশী ঝরে রাষ্ট্র যন্ত্রের চেয়ারগুলো তত বেশী নরম ও আরামদায়ক হয়ে ওঠে। অন্যদিকে কৃষক ও শ্রমিক যদি তার কর্মযজ্ঞ অব্যাহত রাখে অন্যদিকে অন্য পেশাজীবী মানুষ যদি তাদের কাজ কর্ম বন্ধ রাখে তাতে সামাজিক নিয়ম শৃঙ্খলার কিছুটা ব্যহত হলেও সমাজ বা রাষ্ট্রের ভিত্তির কোন ক্ষতি সাধন হয়না ।কোন লেখক যদি মারা যায় তখন আমরা বলি তার জীবদ্দশায় ১০০টি বই লিখে গেছেন আমাদের জন্য, অভিনেতার ক্ষেত্রে বলি ২০০ সিনেমা করে গেছেন আমাদের জন্য,একজন কৃষক মারা গেলে কখনো কি ভাবি তার জীবদ্দশায় আমাদের জন্য ১০০০ টন খাদ্য উৎপাদন করে গেছেন আমাদের জন্য ,অথবা একজন কারখানা শ্রমিকের ক্ষেত্রে কি বলি তার জীবদ্দশায় ৫০০০ পণ্য উৎপাদন করে আমাদের অর্থনীতিতে ভূমিকা রেখে গেছেন এই মহান মানুষটি । দুঃখের বিষয় সমস্ত পেশার অভিভাবক সব চেয়ে সম্মানিত কৃষক ও শ্রমিকের পেশা রাষ্ট্রীয় ভাবে আজও বৈষম্য ও অবহেলার স্বীকার। আজকের এই মে দিবসে কাম্য কৃষক শ্রমিক তার প্রাপ্য সম্মান নিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হোক, তার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় এক সুরে শ্লোগান তুলি …… পৃথিবীর সমস্ত শ্রমজীবী মানুষদের প্রতি রইলো মহান মে দিবসের শুভেচ্ছা ……।।

রবিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮

তুষারের শুভ্রতায় নবরূপে উদ্ভাসিত প্যারিস নগরী


সদ্য শরীরের কাঁটাছেড়া অংশে সকাল থেকে ব্যথার তীব্রতা বেড়েই চলছে। ব্যথা নাশক ঔষদ সেবনে উপশমের চেষ্টা।ব্যথা নিয়েই মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে বাসায় একাকী দিন যাপনের প্রস্তুতি। প্রকৃতি আগাম আভাস না দিয়েই হটাৎ করেই শুরু করেছে বাতাসে তুষারের উড়া উড়ি।যে দৃশ্যর অবতারণ  সাধারণত প্যারিসে খুব একটা মেলেনা।মনে হল দিনটা বাড়তি প্রাপ্তি দিয়ে শুরু হল। ড্রয়িং রুমের প্রতিটি পর্দা তুলে দিয়ে  সোফায় শুয়ে শুয়ে প্রকৃতির আপন মনে এমন খেলা করার  দৃশ্য হৃদয়ে এক ভিন্ন রকম শিহরণ জাগিয়ে  মুহূর্তগুলো রাঙিয়ে দিচ্ছে।বেলকোনিতে মাঝে মাঝে দুটো কালো কবুতর এসে সঙ্গ দিয়ে আবার উড়ে চলে যাচ্ছে সাথে প্রিয়  রবি  সুর। স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী হলাম প্রকৃতির এমন আতিথেয়তায়।  এমন ভালোলাগা শুধু নিজে উপভোগ না করে প্রযুক্তির আশ্চর্য  উদ্ভাবন ফেচবুক লাইভের মাধ্যমে  কিছু সময় ভাগাভাভাগী করলাম বন্ধুদের সঙ্গে ।কিছু ক্ষণের মধ্যে সামনের ছোট্ট পার্কটির  সমতল ভূমির উপর প্রকৃতি তুষারের  সাদা মাদুর বিছিয়ে দিলো। বৃক্ষরাজীর শাখাগুলোর  কাণ্ড পরিণত হল থোকা থোকা  সাদা পুষ্পের  ন্যায় দীর্ঘ দিন অবসর কাটানো ক্যামেরােকে  জাগিয়ে তুললাম প্রকৃতির এমন রূপ ধরে রাখার জন্য অসুস্থ শরীর কিন্তু মনটা বেশ চনমনে হয়ে উঠেছে এরই মধ্যে ।এভাবে দুদিন পার করলে পুরো প্যারিস কি রূপে উদ্ভাসিত হয়েছে সেই কৌতূহল ভেতরে ভেতরে তাড়া দিচ্ছে তা বেশ অনুভব  করছি , কিন্তু সদ্য হসপিটালের  অপারেশনের টেবিল থেকে ফেরা দেহ কি পারবে আমাকে শুভ্র সাদা প্যারিসের রূপ ঘুরে দেখাতে ,সেই আশংকায় দোদুল্যমান মন ।ভেতরে সাহস সঞ্চার করে নিজেকে গৃহকোন থেকে  মুক্ত করে শ্যেন নদীর দিকে রওনা হলাম  

বাঙলার প্রকৃতিতে আষাঢ় শ্রাবণ মাসে  সারা দিন মেঘলা  আকাশ গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির দিনে গৃহবন্দী জীবনের যেমন আলাদা স্বাদ রয়েছে। তেমন এখানকার প্রকৃতিতে শিমূল তুলোর মতো শুভ্র তুষারের উড়ে উড়ে ঝরে পড়ার দৃশ্যও দেহ মনে  এক অন্যরকম শিহরণ জাগায়। প্রতি  বছর প্যারিসের আশেপাশের শহরগুলোতে তুষারপাত হলেও গত পাঁচ   বছরের মধ্যে প্যারিস নগরী  তুষারে শুভ্র সাদায় সাজেনি। ক্রিসমাস বা নয়েল উৎসবগুলোতে  কৃত্রিম তুষারে সজ্জিত করা হয় নগরীর  বড় বড় পর্যটন জনপ্রিয় জনবহুল  এলাকাগুলো।কৃত্রিম সজ্জা থেকে এই শহর নিজের শরীরকে মুক্ত করেছে জানুয়ারির শেষে  কিন্তু আজ প্যারিসকে প্রকৃতি  সাজিয়েছে আপন হাতে।ফ্রান্সে চলমান বন্যা পরিস্থিতির কারণে শ্যেন নদী সাধারণ সীমানার উপর দিয়ে পানি স্রোতের ধারা প্রবাহিত করছে,ফলে  প্রমদতরিগুলো কূলে  নোঙ্গর করে অলস সময় পার করছে, তুষারের শুভ্র প্রলেপের কারণে নদীর  দুই  ধারের  সারি সারি জাহাজগুলোকে  দূর  থেকে মনে হচ্ছে সেনের  তীর  ঘেঁষে সদ্য গড়ে উঠা  পাড়া গাঁয়ে উৎসব চলছে  



রাস্তায় যান চলাচল স্বল্পতার কারণে প্যারিস শহুরে  রূপ হারিয়ে, কোথাও  সাদা বিরান ভূমির মতো , আবার রাস্তার পাশের বিস্তীর্ণ গাছগাছালি ঘন তুষারের 
আবরণে ঢাকা পড়ে  সাদা বনভূমিতে রূপান্তর হয়েছে। বসন্তের আসন্ন  কিন্তু এখনো ফুলেদের আগমনী চিহ্ন চোখে পড়েনি, কিন্তু প্যারিসের এভেনিউগুলোর দুপাশের সৌন্দর্য বর্ধনশীল সারিবাধা গাছগুলো যেন তুষার দিয়ে সাদা  চেরি ফুল ফুটিয়ে দর্শনার্থীদের মধ্য বসন্তের অগ্রিম রূপের সৌন্দর্যে  বিমোহিত করছে।বিখ্যাত    ভাস্করদের  তৈরি ভাস্কর্যগুলোর উপর প্রকৃতি নতুন করে  অলঙ্করণ করেছে, সে দৃশ্য একেবারে কম মনোহর নয় ।এমন দিনে প্যারিসের পথে যে কারও    স্বর্গীয় অনুভূতিতে  দেহ মন আচ্ছাদিত হতে পারে। 






























মনে হল,   প্যারিসের এমন  রুপের দিকে তাকালে প্রেমে পড়বেনা এমন মানুষ খুজে পাওয়াই দায়। শত শত বছর ধরে হাজার হাজার শিল্পী প্যারিসের রুপের উৎকর্ষ সাধনের যে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তা আজ পন্ডশ্রমে পর্যভূষিত।প্যারিসের আজকের রুপের কাছে শিল্পকলার সমস্ত সৃষ্টিই যেন পরাজিত। যে হৃদয় পাথরসম অনুভূতিহীন প্যারিসের আজকের প্রকৃতি সেই হৃদয়ে প্রাণের সঞ্চার করতে দুহাত বাড়িয়ে ডাকছে ।প্রকৃতির এই সৌন্দর্য্য ধরে রাখার জন্য ক্যামেরা হাতে বেড়িয়ে পড়েছে অসংখ্য সৌন্দর্য় পিপাসু্ মানুষ নিজেকে স্মৃতি করে রাখার জন্য। বৃষ্টির দিনে বাংলার দুরন্ত কিশোর কিশোরী যেমন বৃষ্টিতে ভিজে তার দুরন্তপনা দুষ্টমীতে প্রকৃতির হেয়ালীপনাকে সার্থক করে তোলে, তেমনি প্যারিসের বুকে বেড়ে ওঠা দুরন্ত কিশোর কিশোরীর দলও প্রকৃতির এই উৎসবের দিনে উজার করে উচ্ছাস ঢেলে দিচ্ছে। বাংলার বর্ষা ,বসন্ত,শরৎ যেমন প্রেমিক প্রেমিকার মনে দোলা দেয়,অনুভূতিতে ভিন্নতা আনে,হৃদয়ের রংয়ের বৈচিত্রতা আনে ,কিন্ত পশ্চিমা প্রেমিক 
প্রেমিকার হৃদয়ে আমাদের মত এত বৈচিত্রতা না থাকলেও আজকের প্যারিসের প্রকৃতি অবশ্যই ওদেরকে রোমাঞ্চিত করছে। 
আলোকচিত্র : মুহাম্মদ গোলাম মোর্শেদ

শুক্রবার, ১৩ অক্টোবর, ২০১৭

প্যারিস প্রবাসী চিত্রশিল্পী মুহিতের অকালপ্রয়াণ


তিন দিন আগে ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে জেনেছিলাম মুহিত ভাই (মুহিত আহমেদ জ্যোতি) গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে অচেতন প্রহর পার করছেন। অক্টোবর কাজ শেষ করে কর্মস্থল ত্যাগ করেই হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হলাম। যাওয়ার সময় পথে সংগীতশিল্পী আরিফ রানা ভাইয়ের ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে একটু থমকে গেলাম।

তিনি লিখেছেনআজকে হাসপাতালে গিয়ে জানতে পেরেছি বন্ধু মুহিতের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। ডাক্তারেরা আশা ছেড়ে দিয়েছেন। একজন সেবিকা জানালেন তোমাদের যা কিছু করণীয় শুরু করতে পার...কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না...একটি অলৌকিক কিছুর অপেক্ষায় আছি... কেন এখনই চলে যাওয়ার তাড়া, অনেক কাজ আছে বাকি, শেষ করতে হবে অসমাপ্ত সব ছবি, ঝগড়া, অভিমান এখনো যে বাকি...। 

স্ট্যাটাসটা পড়ে বুকের মধ্যে একটা কাঁপন অনুভব করলাম। মেট্রো থেকে নেমেই এক পথচারীকে জিজ্ঞেস করে হাসপাতালের দিকে দ্রুত ছুটে গেলাম। হাসপাতালের নিজতলায় সংস্কৃতিকর্মী অলকা দিদিসহ প্যারিসের আরও কয়েকজন মুহিত ভাইকে দেখার জন্য অপেক্ষা করছেন। দ্বিতীয়তলায় কেবিনের সামনে বসা কয়েকজন সমমনা বন্ধুর বিমর্ষ মুখচ্ছবি বলে দিচ্ছে সত্যি কোনো খারাপ সময়ের অপেক্ষায় আছি। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে মুহিত ভাইয়ের কেবিনের দিকে আমরা কয়েকজন এগোতে লাগলাম। কেবিনের বিছানায় নিথর পড়ে আছে দেহ, দুই চোখে প্রশান্তির ঘুম। মুখের সঙ্গে লাগানো যন্ত্রের সাহায্যে চলছে শ্বাসপ্রশ্বাস। 

আমি কেবিনে দাঁড়িয়ে বুকের স্পন্দন দেখছি আর আশায় বুক বাঁধছিমুহিত ভাই জেগে উঠবেন, সৃষ্টিকর্তা দয়া করে আবার আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেবেন তাঁকে। কিছুক্ষণ পর করিডরে অবস্থান নিলাম। ২০ মিনিট পর ঘড়িতে রাত ৮টা ৪৫ মিনিট। অলকাদি কান্নাভেজা চোখে করিডরে এসে জানালেন, শ্বাসপ্রশ্বাস যন্ত্র খুলে ফেলা হয়েছে। বুঝতে দেরি হলো না, আশাভঙ্গ হয়েছে, মুহিত ভাই দেহত্যাগ করে ওপারে রওনা হয়েছেন। অর্থাৎ কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেছেন। সদা হাস্যোজ্জ্বল যে মানুষটি আমাদের মাঝে ঘুরে বেড়াতেন, তিনি এভাবে অতীত হয়ে যাবেন ভাবতে কষ্ট হচ্ছিল। আবার ভেতরে প্রবেশ করলাম, এবার যন্ত্রপাতি ছাড়া বিছানায় শুধুই মুহিত ভাইয়ের নিথর দেহ। তাঁর সাত-আট বছরের কন্যাসন্তানটি কিছুক্ষণ আগে আশপাশে স্বাভাবিকভাবে ঘুর ঘুর করছিল বাবার সুস্থতার অপেক্ষায়। তাকে এবার দেখলাম অপেক্ষমাণ কক্ষে বাবা হারানোর বেদনায় কান্নাভেজা চোখে। এমন দৃশ্য দেখা সত্যি কঠিন। 

মুহিত ভাই ছিলেন প্রতিভার অধিকারী। কিন্তু প্রতিভার অহংকারমুক্ত একজন সংস্কৃতি শ্রমিক। দূর পরবাসে বাংলা সংস্কৃতির চর্চা বিকাশের জন্য যে মানুষগুলো নিঃস্বার্থ নিবেদিতপ্রাণ, মুহিত ভাই প্যারিসের বাংলা কমিউনিটির সংস্কৃতি অঙ্গনে তেমনি এক শিল্প ভাবনার এক সাধক মানুষ। তার সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপ-আলোচনা বা আড্ডার সুযোগ আমার খুব কম হয়েছে। যতটুকু কথা, যোগাযোগ আন্তরিকতার সৃষ্টি হয়েছিল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে। আমার জানা মতে তিনি কোনো তারকা শিল্পী ছিলেন না। কিন্তু শিল্প সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে যে ধরনের আদর্শিক চারিত্রিক গুনের মানুষ হওয়া যায়, সেই গুণাবলি তাঁর চলনবলন, কথা মানুষের সঙ্গে মেশার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেত। প্যারিসের কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠনের অনুষ্ঠান তাঁর রং-তুলির আঁচড় কিংবা তাঁর উপস্থাপনা ছাড়া যেন একটু অসম্পূর্ণ থেকে যেত। নিজে নানা গুনের অধিকারী হলেও, সামান্য গুনের মানুষকেও অন্যের কাছে বড় করে উপস্থাপন করতেন। বন্ধু মনে করে কখনো ঠাট্টার ছলে কাউকে কিছু বললে, তা কেউ গ্রহণ করতে না পারলে তা আবার ঠাট্টা মধ্য দিয়ে মুহূর্তেই পরিবেশ আনন্দঘন করার এক সম্মোহনী গুনের অধিকারী ছিলেন।
প্যারিসে অক্ষর নামে কবিতাভিত্তিক একটি সংগঠনের সঙ্গে আমি জড়িত। ডিজিটাল যুগে সব অনুষ্ঠানে ডিজিটাল প্রিন্টিং ব্যানার ব্যবহার হলেও আমাদের কবিতার অনুষ্ঠানগুলোর ব্যানার হতো মোহিত ভাইয়ের শৈল্পিক হাতের রং তুলির তৈরি ব্যানার দিয়ে। শুধু ব্যানারের কারণেই অনুষ্ঠানের ষাট ভাগ সৌন্দর্য বেড়ে যেত। অনুষ্ঠানের দিন কখনো ব্যানারটি আমাদের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকতেন না। নিজের থেকেই মঞ্চসজ্জা থেকে শুরু করে অনুষ্ঠানের শেষ পর্যন্ত সার্বিক সহযোগিতায় পাশে থাকতেন। এত কিছু করার পর আবার মঞ্চে গিয়ে কবিতা পাঠের মধ্য দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করতে কোনো বিচ্যুতি ধরা পড়ত না। 

একজন শিল্পীর শৈল্পিক সেবার পাশাপাশি যে সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকে, সেই কর্তব্যের জায়গায় তিনি ছিলেন যথেষ্ট সচেতন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সামাজিক সংকটে প্রবাসের যে প্রতিবাদ, মানববন্ধন হয়, সেই সব জাতীয় আপামর মানুষের স্বার্থের কর্মসূচিগুলোতে মুহিত ভাইয়ের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যেত।
প্যারিসের বৃহৎ বাংলা কমিউনিটির মধ্যে বাঙালি সংস্কৃতির তারকা ব্যক্তিত্ব অনেকই রয়েছেন। কিন্তু মুহিত ভাইয়ের মতো সেবক বা শ্রমিকমনা সংস্কৃতি কর্মীর সংখ্যা খুব কম। তাঁর এমন প্রস্থান কমিউনিটির সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি করল তা পূরণ হওয়ার নয়। যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন। আপনার কর্ম রেখে যাওয়া সৃষ্টির মাধ্যমে আপনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।
প্যারিসপ্রবাসী শিল্পী মুহিতের অকালপ্রয়াণ (প্রথম আলো)